ঈদুল ফিতরের দিন সুন্নত আমল সমূহ

ঈদুল ফিতরের দিন যে সুন্নত সমূহ রয়েছে তা প্রত্যেক মুসলমানের গুরুত্বের সাথে আদায় করা উচিত। ঈদ অর্থ হলো আনন্দ এবং ফিতর অর্থ রোজা ভঙ্গ করা। অর্থাৎ, ঈদুল ফিতর হলো রোজা ভাঙ্গার আনন্দ বা উৎসব। চলুন দেখে নেই, রাসূলুল্লাহ(স.) ঈদুল ফিতরের দিন কোন সুন্নতগুলা আদায় করতেন।

ঈদুল ফিতরের দিন সুন্নত আমল সমূহ

সুন্নত শব্দের অর্থ আদর্শ, জীবনধারা, রাস্তা, পথ। সাধারণত মহানবী (স.) এর কথা, কাজ এবং মৌন সম্মতিকেই সুন্নত বলা হয়ে থাকে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন খুব গুরুত্বের সাথে বেশ কিছু কাজ করতেন। এগুলোই মূলত ঈদুল ফিতরের সুন্নত।

গোসল ও পবিত্রতা অর্জন

ঈদুল ফিতরের দিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গোসল করার সুন্নত। হাদিস থেকে প্রমাণিত হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, "নবীজি (স.) ঈদের দিন নামাজের জন্য বের হওয়ার আগে গোসল করতেন" - ইবনে মাজাহ। এ দিনে অন্যান্য দিনের তুলনায় ঘুম থেকে দ্রুত জাগ্রত হতে হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দিনে নামাজের আগে গোসল করতেন। যেহেতু মহানবী (স.) ঈদের দিন তাড়াতাড়ি গোসল করতেন সুতরাং এটি একটি সুন্নত কাজ যা প্রত্যেক সাহাবী অনুসরণ করতেন।
ঈদুল ফিতরের দিন গোসল করার মাধ্যমে যেমন আমাদের একদিকে সুন্নত আদায় হয় অন্যদিকে আমাদের শরীর থাকে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। ফজরের পর মেসওয়াক ও গোসল করার মাধ্যমে আমাদের পবিত্রতা অর্জন হয়। ঈদের দিনে গোসল করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। যা একটি জোরালো সুন্নত। সাহাবায়ে কেরামরা সকলে নিয়ম মেনে প্রতি ঈদে সুন্নাত গুরুত্বের সাথে আদায় করতেন। এজন্য আমরা সকলে ঈদুল ফিতরের দিন তাড়াতাড়ি গোসল করার মাধ্যমে এ সুন্নত আদায় করব।
ঈদুল ফিতরের দিন সুন্নত আমল সমূহ

উত্তম পোষাক পরিধান করা

ঈদুল ফিতরের দিন উত্তম পোষাক পরিধান করা রাসূলুল্লাহ(স.)এর সুন্নত। উত্তম পোশাক মানে যে নতুন পোশাক হতে হবে এমন কোন কথা না, তবে অবশ্য সেটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং শালীন হতে হবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ(স.)ঈদুল ফিতরের দিন গোসল করার পর সবথেকে উত্তম পোশাকটি পরিধান করতেন। হযরত জাবির(রা:) বলেন - "নবী (স.)এর একটি বিশেষ প্রচার পোশাক ছিল যা তিনি ঈদ ও জুমার দিন পরিধান করতেন" - ইবনে খুজাইমা।

সকলের সাধ্যের মধ্যে উত্তম পোশাক পরিধান করা সুন্নত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদে সবথেকে সুন্দর এবং উত্তম পোশাকটি পরিধান করতেন। এজন্য আমরাও নবীজি (স.) এর এই সুন্নতটি গুরুত্বের সাথে আদায় করার চেষ্টা করব। আমরা সকলে ঈদুল ফিতরের দিন তাড়াতাড়ি গোসল করার পরে উত্তম ও সুন্দর পোশাক পরিধান করে ঈদগাহে যাব, এর মাধ্যমে আমাদের একটি সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।

সুগন্ধি ব্যবহার করা

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। ঈদুল ফিতরও তার ব্যতিক্রম না। এদিনেও তিনি গোসল করার পরে সুন্দর উত্তম পোশাক পরিধান করে সুগন্ধি লাগাতেন তারপর তিনি পায়ে হেঁটে ঈদগাহের উদ্দেশে রওনা হতেন এবং জামাতের সাথে ঈদের সালাত আদায় করতেন। তবে ঘরের বাহিরে নারীদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার জায়েজ নয়। আমরাও ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে সুগন্ধি ব্যবহার করব এবং এ সুন্নতটি আদায় করবো

ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া

মুসলিম উম্মাহর জন্য দুইটি সব থেকে আনন্দের উৎসব রয়েছে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। ঈদুল ফিতরের দিন মুসল্লিরা ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে মিষ্টি জাতীয় কিছু খেয়ে তারপর নামাজে যাওয়া সুন্নত। হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী (স.) ঈদগায় নামাজ আদায় করতে যাওয়ার আগে খেজুর খেতেন - সহিহ বুখারী। "মহানবী (স.) ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না এবং কুরবানীর দিন নামাজের পূর্বে কিছু খেতেন না" - তিরমিজি : ৫৪২ ও সহীহ ইবনে হিব্বান : ২৮১৪

ঈদগাহে যাওয়ার আগে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা

সাদকাতুল ফিতর সাধারণত ওয়াজিব। তবে মহানবী (স.) যেহেতু ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে ফিতরা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি নিজেও ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে ফিতরা আদায় করতেন সেহেতু এটি একটি সুন্নত। ইসলামী শরীয়ত অনুসারে, ফিতরা আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। এজন্য সমাজে আমরা যারা বিত্তশালী বা সামর্থ্যবান আছি তারা ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সদকাতুল ফিতর আদায় করব।

ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবির পাঠ করা

ঈদুল ফিতরের দিন বেশি বেশি তাকবীর পাঠ করা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। ঈদের দিন যে তাকবীর পাঠ করতে হয় তা হলো - আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। অর্থ : আল্লাহ সবচেয়ে বড় আল্লাহ সবচেয়ে বড় আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আল্লাহ সবচেয়ে বড়। আল্লাহ সবচেয়ে বড় এবং সকল প্রশংসা আল্লাহরই জন্য। ঈদুল ফিতর এর দিন এ তাকবিরটি পাঠ করা সুন্নত।

আরো পড়ুন : ফজরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু থেকে শেষ বিস্তারিত

এ তাকবীরটি সাধারণত রমজান মাসের শেষ দিন অর্থাৎ শেষ রোজার দিন চাঁদ দেখার পর থেকে শুরু করে ঈদের নামাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত এই তাকবীর পাঠ করা সুন্নত। ঈদগাহে যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করা সুন্নত। এই তাকবীর পাঠের মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব বা বড়ত্ব ঘোষণা এবং রমজান শেষে ঈদ উদযাপনের আনন্দ। মহানবী (স.) ঈদের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছানো পর্যন্ত এবং নামাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত এ তাকবীর পাঠ করতেন।

পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া

ঈদের দিন পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া মহাননবী (সঃ) এর সুন্নত। আমাদের উচিত কোন যানবাহন ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া কারণ এটি উত্তম এবং এতে বেশি সওয়াব রয়েছে। যেহেতু মহানবী (সঃ) পায়ে হেঁটে ঈদগায়ে যেতেন এজন্য আমরাও পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাবো। আমাদের সকলের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং পায়ে হেঁটে ঈদগাহ থেকে বাসায় ফিরতেন।

ঈদগাহে যাওয়ার এবং আসার রাস্তা পরিবর্তন

ঈদের দিনে ঈদগাহ ময়দানে এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং অন্য পথ দিয়ে বাড়ি ফিরে আসা সুন্নত। হযরত জাবির (রা:) থেকে বর্ণিত - " রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়া আসার রাস্তা পরিবর্তন করতেন" তিরমিজি : ১২৯৫। রাস্তায় চলার সময় ডান দিক দিয়ে চলাচল করা সুন্নত। আমরা ঈদগাহে যাওয়ার সময় ডান দিক দিয়ে ঈদগাহে যাব এবং ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার সময় ডানদিক দিয়ে হেঁটে বাড়ি আসবো। এর ফল আমাদের একটি সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।

ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় করা

যদি কারো কোন অপারগতা না থাকে তাহলে অবশ্যই ঈদের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে আদায় করতে হবে, কারণ ঈদের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে আদায় করা সুন্নত। যদি কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোন বড় ধরনের সমস্যা না দেখা দেয় তাহলে খোলা ময়দানে বা ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা সুন্নত। মহানবী (সঃ) প্রতি ঈদের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে আদায় করতেন।

ঈদগাহে শিশুদের নিয়ে যাওয়া

মহানবী (সঃ) ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করার জন্য ঈদগাহে যাওয়ার সময় শিশুদের সাথে নিয়ে যেতেন এবং উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করতেন। এজন্য আমরাও আমাদের সন্তান বা শিশুদের সাথে করে ঈদগাহে নিয়ে যাব এবং এই সুন্নত আদায় করবো। শিশুদের ঈদগাহে বা মসজিদে নিয়ে গেলে তারা ছোটবেলা থেকে ইসলামের সৌন্দর্য, রীতিনীতি এবং বড়দের সাথে ইবাদত করা সম্পর্কে শিখতে ও জানতে পারবে

ঈদের সালাত শেষে খুতবা শোনা

ঈদের নামাজের পর খুতবা পাঠ করা সুন্নত। আর এই খুতবা শোনাও সুন্নত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন নামাজ আদায় করতেন তারপর তিনি খুতবা দিতেন - বুখারী, মুসলিম। নবী(সঃ) খুতবা দিতেন কেউ চাইলে বসে শুনতে, আর কেউ চাইলে চলে যেত - সহীহ বুখারী। যদি খুতবা শোনা ওয়াজিব হতো তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বাধা দিতেন বা নিষেধ করতেন যেহেতু তিনি বাধা দেন নাই বা নিষেধ করে নাই তাহলে এটি ওয়াজিব নয়। এজন্য আমরা ঈদের সালাত শেষে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবো।

ঈদুল ফিতরের দিন সুন্নত আমল সমূহ সম্পর্কে শেষ কিছু কথা

ঈদুল ফিতর সাধারণত মুসলিম উম্মার জন্য খুব আনন্দের একটি দিন। ঈদুল ফিতরের দিন সুন্নত আমল সমূহ সম্পর্কে আর্টিকেলে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে যা আপনার জন্য হতে পারে অনেক উপকারী কারণ, এখানে মহানবী (সাঃ) ঈদের দিনের সুন্নত সমূহ পালন করতেন তা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ঈদ হচ্ছে আমাদের সকলের জন্য আনন্দের দিন, এ দিনে হাসিখুশি থাকা, শুভেচ্ছা বিনিময় করা, ভ্রাতৃত্ব বোধ প্রকাশ এসব প্রত্যেক মুমিনের গুনাগুন।

সুন্নত সাধারণত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দেখিয়ে গেছেন এবং তিনি নিজে যা করেছেন এবং সাহাবাগণদের যেসব কাজে সমর্থন করেছেন সেটাই হলো সুন্নত। ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি করা এটি কোন সুন্নত আমল নয়। তবে আপনি চাইলে করতে পারবেন কিন্তু এটিকে সুন্নত বা ইবাদত মনে করে করা যাবে না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত নিয়মিত পালন করতে হবে এবং এটিকে আঁকড়ে ধরতে ধরে রাখতে হবে কারণ, এটি হচ্ছে ঈমানের সৌন্দর্য। আমরা সবাই ঈদুল ফিতরের দিনের সমস্ত সুন্নত সুন্দর এবং নিয়মানুবর্তিতার সাথে পালন করব ইনশাআল্লাহ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

Md. Jafor Sadik
Md. Jafor Sadik
আমি একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও টেক ভার্স ইনফোর Owner। আমি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করি। ৫ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছি।