ফজরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু থেকে শেষ বিস্তারিত এ সম্পর্কে আমাদের জানা অতীব
জরুরী। সময়মতো সালাত আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ। হাদিসের আলোকে ফজরের
নামাজের ওয়াক্ত শুরু থেকে শেষ বিস্তারিত জানতে নিচের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো
পড়ার অনুরোধ রইলো।
এতক্ষণ সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এ আর্টিকেলে আমরা ফজরের ওয়াক্ত
শুরু, ফজরের ওয়াক্ত শেষ,ফজরের নামাজের সর্বোত্তম সময়, ফজরের নামাজ কাজা হয়ে
গেলে করণীয়, ফজরের নামাজের গুরুত্ব এ সবকিছু নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে
আলোচনা করবো।
পেজ সূচিপত্র: ফজরের নামাজের শেষ সময়
ফজরের ওয়াক্ত শুরু
প্রত্যেক মুসলমানের নামাজের সময়ের ব্যাপারে সাধারণ জ্ঞান রাখা জরুরী। একবার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো সর্বোত্তম আমল
কোনটি? উত্তরের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "প্রতি নামাজ
তার শুরুর ওয়াক্তে পড়া" - আবু দাউদ: ৪২৬।ফজরের নামাজের সময় শুরু হয় সুবহে
সাদিক হওয়ার সাথে সাথে। সুবহে সাদিক বলতে রাতের শেষে পূর্ব দিগন্তে লম্বা আকৃতির
যে আলোর রেখা দেখা যায় তাকে বোঝায়। মূলত এ সময় থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে
যায়। হাদিসে আছে, "যে ব্যক্তি সূর্য ওঠার পূর্বে ফজরের এক রাকাতও পড়তে
পারলো সে ফজরের সালাত পেয়ে গেল" - বুখারী: ৫৭৯। হানাফী আলেমগণদের মতে,
ইসফার বা ফর্সা হলে ফজরের সালাত আদায় করা মুস্তাহাব। ইসফার অর্থ সুবহে
সাদিক বা ফর্সা - হানাফী আলেমগণদের মতে।
হাদিসে বর্ণিত আছে, "মহানবী (স.) ফজরের সালাত অন্ধকার থাকতে থাকতে আদায় করতেন"-
বুখারী: ৫৬০। জিবরাঈল (আ.) নবীজি (স.) কে ফজরের সময়
শিখিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গালাস বা খুব
ভোরের অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে ফজরের সালাত আদায় করতেন। রাসূলুল্লাহ (স.)
জীবনে শুধু একবার ফর্সা হওয়ার পর ফজর পড়েছিলেন। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত
দ্বিতীয়বার তিনি কোনদিন ফর্সা অবস্থায় ফজরের সালাত আদায় করেননি। ইমাম আবু
হানিফা, আবু ইউসুফ, রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম তাহাভী এর মতে হাদিসের
দিক নির্দেশনা অনুসারে ফজরের নামাজ অন্ধকারে অর্থাৎ, আলো আঁধারিতে শুরু করা
উচিত।
এক হাদিসে বর্ণিত আছে, মুসলিম নারীরা ফজরের ওয়াক্তে সারা শরীর চাদর দিয়ে ঢেকে
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মসজিদে ফজরের জামায়াতে
হাজির হতেন। এরপর সালাত আদায় শেষ হলে তারা নিজ নিজ ঘরে যখন ফিরে যেতেন তখন
এতোটুকু অন্ধকার থাকতো যে, তাদের কেউ একে অপরকে চিনতে পারতেন না। (বুখারী ৫৭৮,
ইফা ৫১)
ফজরের ওয়াক্ত শেষ
সাধারণত সূর্য ওঠার পর আর ফজরের নামাজ আদায় করা যায় না। অর্থাৎ, ফজরের
নামাজের শেষ সময় হলো সূর্য ওঠার ঠিক আগ পর্যন্ত। সূর্যের উপরের অংশে যখন দিগন্ত
রেখায় দেখা যায় তখন ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ, সূর্য উদিত
হওয়া শুরু করলে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়। আব্দুল্লাহ বিন আমর ( রা.) হতে
বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "ফজরের সালাতের সময়
সুবহে সাদিক থেকে শুরু হয় আর এর সময় থাকে সূর্য উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত"
(মুসলিম -৬২২)। এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, সূর্য ওঠার ঠিক আগ
পর্যন্তই ফজরের নামাজের সময় সীমাবদ্ধ থাকে। হাদিসের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী,
ফজরের নামাজ অন্ধকারে তথা আলো-আঁধারিতে শুরু করা এবং একটু ইসফার অর্থাৎ, ফর্সা হলেই শেষ
করা উচিত (শারহু মাআনিল আসার)
ফজরের নামাজের জন্য সর্বোত্তম সময়
ফজরের নামাজের জন্য সর্বোত্তম সময় হচ্ছে সুবহে সাদিক থেকে শুরু করে সূর্য ওঠার
ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। তবে আকাশ কিছুটা ফর্সা হয়ে এলে ফজরের সালাত আদায়
করা সবচেয়ে উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন, "তোমরা ফজরের সালাত ফর্সা করে পড়ো। কেননা এতে সওয়াব বেশি" (আবু দাউদ -
৪২৪)। ইসফার বা ফর্সা হলো এমন একটি সময় যখন ভোরের আলো পূর্ব আকাশে
ছড়িয়ে পড়ে কিন্তু সূর্য পুরোপুরি উদিত হয় না। তবে সূর্যোদয়ের ঠিক
মুহূর্তে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করা আছে। এ সময় সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ কারণ,
এটি হচ্ছে নিষিদ্ধ সময় বা মাকরুহ সময়াা এসময় কাফিররা সূর্য পূজা করত তাই ইসলাম
এ সময়ে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করেছে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ফজরের ওয়াক্তের সময় গুলো হল:
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাজ আদায় করলেন যখন ভোর
বিদ্যুতের মত আলোকিত হলো এবং যে সময় রোজাদারদের উপর পানাহার হারাম হয়। তিনি
ফজরের নামাজ আদায় করলেন যখন জমি আলোকিত হয়ে গেল। অতঃপর, জিব্রাইল আলাইহি
ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকিয়ে বললেন হে মুহাম্মদ (স.) এটাই হলো আপনার আগে
আগমনকারী নবীদের নামাজের ওয়াক্ত বা সময়। নামাজের ওয়াক্ত এই দুই সীমার মাঝে
সীমাবদ্ধ" ( তিরমিজি, আবু দাউদ, মিশকাত)
প্রত্যেক মুমিনের উচিত ফজরের নামাজ সুবহে সাদিকের পর সঠিক ওয়াক্ত নিশ্চিত করে
সালাত আদায় করা এবং নির্ধারিত সময়ে নামাজ পড়ে কুরআনের নির্দেশ বাস্তবায়ন
করা
ফজরের নামাজ কাজা হয়ে গেলে করণীয়
ফজরের নামাজ কাজা হয়ে গেলে করনীয় কি তা নিচে ইসলামের আলোকে ব্যাখ্যা করা
হলো: অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে আমাদের ফজরের নামাজ কাজা হয়ে যায়।
অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘুম থেকে উঠতে না পারা বা কোন কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে নামাজ কাজা
হয়ে গেলে এর ফলে কোন গুনাহ হয় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন, "যে ব্যক্তি নামাজ ভুলে যায় বা ঘুমিয়ে পড়ে সে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথেই
নামাজ আদায় করবে" (সহিহ বুখারী, মুসলিম)। ঘুম বা ভুলের কারণে
অনিচ্ছাকৃতভাবে ফজরের নামাজ কাজা হয়ে গেলে গুনাহ হবে না। কিন্তু
ইচ্ছাকৃতভাবে কাজা করলে এটি গুনাহের কাজ এবং আল্লাহর কাছে অবশ্যই এর জন্য তওবা
করতে হবে।
তবে ফজরের নামাজ কাজা হয়ে গেলে ঘুম ভাঙার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা আদায় করে
নিতে হবে।সূর্য পুরোপুরি ওঠার ১৫ - ২০ মিনিট পর এ সালাত আদায় করে নিতে হবে (এই
সময়টুকু কে নিষিদ্ধ সময় বলা হয়)। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিষিদ্ধ সময় বা
সূর্যোদয়ের ঠিক মুহূর্তে ফজরের সালাত আদায় করা যাবে না বরং যোহরের ওয়াক্তের
আগে এর মধ্যে যেকোনো সময় এই কাজা নামাজ আদায় করে নেওয়া সব থেকে উত্তম।
এতে শুধু ফরজ দুই রাকাত সালাত আদায় করে নিলেই যথেষ্ট হবে। আমাদের কাজা
নামাজ আদায় করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সময়মতো সালাত আদায় করার অভ্যাস গড়ে
তুলতে হবে।
ফজরের নামাজের গুরুত্ব
আমরা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ
পাই। ফজরের নামাজ হলো দিনের শুরুতে আল্লাহর সাথে বান্দার প্রথম
সাক্ষাৎ। এছাড়াও ফজরের সালাতের অনেক ফজিলত রয়েছে, এটি অনেক ফজিলতপূর্ণ
একটি সালাত। ফজরের নামাজ মানসিক শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা শেখায়।
কেউ যদি ফজরের নামাজ নিয়মিত আদায় করতে পারে, তাহলে সে দিনের শুরুটা
ইতিবাচক ভাবে শুরু করতে পারে। ফজরের নামাজের ফজিলত অপরিসীম। মহান আল্লাহ
তা'আলা কুরআনে বলেছেন, "নামাজ কায়েম কর সূর্যাস্ত থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত
এবং ফজরের কুরআন পাঠের সময়, কেননা ফজরের কোরআন পাঠ সাক্ষীপ্রাপ্ত" (সূরা বনি
ইসরাইল আয়াত:৭৮)। হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতে
পড়ে সে আল্লাহর জিম্মায় থাকে" (মুসলিম হাদিস:৬৫৭)।
ফজরের সালাতের গুরুত্ব অপরিসীম। এ সালাত আদায়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা'আলা
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেন, পুরো দিন আমাদের জন্য বরকতময়
হয়, এছাড়াও আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনে ভূমিকা রাখে। আরও একটি হাদিসে
বর্ণিত আছে, "যে ফজর ও এশার নামাজ পড়ে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে" (সহিহ
বুখারী হাদিস ৫৬৫)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "ফজরের দুই রাকাত সুন্নত
দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছুর চেয়েও উত্তম" (সহিহ মুসলিম)। সুতরাং আমরা এ হাদিস
থেকে বুঝতেই পারছি ফজরের সালাতের গুরুত্ব ঠিক কতোটা। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের
মধ্যে ফজরের সালাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ।রাসূলুল্লাহ (স.)
বলেছেন, "ফজর ও আসরের নামাজে ফেরেশতারা একত্রিত হন" (সহিহ বুখারী ও
মুসলিম)।
শেষ কিছু কথা: হাদিসের আলোকে ফজরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু থেকে শেষ বিস্তারিত
যখন ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায় এবং ওয়াক্ত শেষ হওয়ার ঠিক মুহূর্ত পর্যন্ত
আমাদের ফজরের সালাত আদায় করার সময় থাকে। সুতরাং, সুবহে সাদিক থেকে শুরু করে
নিষিদ্ধ সময়ের আগ পর্যন্ত আমাদের ফজরের সালাত আদায় করতে হবে। কোন কারণে
ফজরের সালাত কাজা হয়ে গেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সূর্যোদয়ের নিষিদ্ধ সময়টুকু
বাদ দিয়ে ফরজ দুই রাকাত সালাত আদায় করে নিতে হবে। মুসলমানদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত
নামাজ ফরজ ঘোষণা করা হয়েছে। এজন্য প্রত্যেক মুমিনের উচিত পাঁচ ওয়াক্ত
নামাজ সময়মতো আদায় করা। আমাদের নামাজ যেন কোন কারণে কাজা না হয়ে যায় এই
সম্পর্কে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের অনেকেরই ফজরের নামাজ কাজা হয়ে
যায়।ইচ্ছাকৃতভাবে ফজরের সালাত কাজা হয়ে গেলে এর জন্য গুনাহ এর ভাগিদার হতে
হবে এবং রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। এক হাদিসে রাসূল (স.) স্বপ্নে এমন কিছু লোককে
দেখেছেন যাদের মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ করা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলে বলা হয় - "এরা
সেই লোক, যারা ফজরের নামাজে অলসতা করত" (সহীহ বুখারী) সুতরাং, এটি হচ্ছে আমাদের
জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url