শিশুদের নিউমোনিয়া রোগ: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ
নিউমোনিয়া মূলত ফুসফুসের একটি সংক্রামক যা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের দ্বারা সংক্রমিত হয়ে থাকে। শিশুদের জন্য এটি একটি গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের রোগ। শিশুদের সুরক্ষার জন্য আমাদের এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।
সঠিক চিকিৎসা না হলে এ রোগটি শিশুদের জন্য একটি মারাত্মক ব্যাধি হতে পারে। এমনকি জীবন ঝুঁকিরও কারণ হতে পারে। শিশুদের নিউমোনিয়া রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো।
পেজ সূচিপত্র: শিশুদের নিউমোনিয়া রোগ: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ
- নিউমোনিয়া কি?
- শিশুদের নিউমোনিয়ার কারণ
- শিশুদের নিউমোনিয়ার লক্ষণ
- শিশুদের নিউমোনিয়া রোগের প্রতিকার
- শিশুদের নিউমোনিয়া রোগের প্রতিরোধ
- নিউমোনিয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ
- জরুরি কিছু তথ্য (নিউমোনিয়া সংক্রান্ত)
নিউমোনিয়া কি?
নিউমোনিয়া ফুসফুসের একটি সংক্রামক ব্যাধি। এ সংক্রমণ সাধারণত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে। এটি শিশুদের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যার সৃষ্টি করে। এই ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক ফুসফুসের আলভিওলাই অংশে সংক্রমণের মাধ্যমে ফুসফুসে তরল বা পুঁজ জমে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যার সৃষ্টি করে। যার ফলে নিউমোনিয়ার সৃষ্টি হয় এবং শিশুদের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
আরো পড়ুন:ঘরোয়া পদ্ধতিতে চুলের যত্ন নেওয়ার কার্যকরী ১০ টি টিপস
শিশুদের নিউমোনিয়ার কারণ
সাধারণত ৫ বছর বা এর চেয়ে কম বয়সের বাচ্চারা নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। শিশুদের নিউমোনিয়া হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রধান কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
ব্যাকটেরিয়াল ও ভাইরাস সংক্রমণ: শিশুরা সব থেকে বেশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের সংক্রমণের ফলে। নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী কিছু প্যাথোজেন হলো: স্ট্রেপ্টোকক্কাস, নিউমোকক্কাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গ্রুপ বি স্ট্রেপ্টোকক্কাস, মাইকোপ্লাজমা নিউমোনিয়া, প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, আরএসভি, নিউমোসিস্টিস, ক্রিপটোকোকাস ইত্যাদি। এই প্যাথোজেনগুলোই নিউমোনিয়ার সৃষ্টির প্রধান কারণ।
পরিবেশগত কারণে সংক্রমণ: আমাদের পরিবেশ এখন নিয়মিত বিভিন্ন কারণে দূষিত হচ্ছে যার ফলে বাচ্চাদের নিউমোনিয়ায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। ধূমপান, বায়ু দূষন, ধুলো, ঠান্ডা আবহাওয়া ইত্যাদির কারণেও বাচ্চারা নিউমোনিয়া আক্রান্ত হচ্ছে।
দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: অনেক শিশু রয়েছে যারা অপুষ্টিতে ভোগে। আবার কিছু শিশু আছে যারা মায়ের দুধ না খাওয়ার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক থাকে।সাধারণত এ ধরনের শিশুদেরও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
টিকা না দেয়া: শিশুর জন্মের পর টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিছু টিকা রয়েছে যা নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সহায়তা করে। এই টিকা না দেয়ার কারণে শিশুরা সাধারণত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়।
শিশুদের নিউমোনিয়ার লক্ষণ
নিউমোনিয়ার প্রাথমিক কিছু লক্ষণ রয়েছে যা দেখে খুব সহজেই তা শনাক্ত করা যায়। নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো: শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর (কম থেকে বেশি), কাশির সময় ব্যথা, সর্দি, গলা ব্যথা, খাদ্য গ্রহণে অনীহা, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, অক্সিজেনের অভাবে শরীরে নীলচে ভাব আসা, অতিরিক্ত দুর্বলতা ইত্যাদি। উপরোক্ত উপসর্গ গুলোর মধ্যে কোন একটি দেখা দিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
শিশুদের নিউমোনিয়া রোগের প্রতিকার
শিশুদের নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ দেখা দিলে এবং রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করে চিকিৎসার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে আক্রান্ত শিশু সুস্থ হয়ে যায়। কিভাবে শিশুদের নিউমোনিয়া রোগের প্রতিকার করবেন তা জেনে নিন:
ডাক্তারের চিকিৎসা: ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভাইরাসজনিত সংক্রমণ হলে সাপোর্টিভ চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে ফুসফুসের এক্সরে ও ব্লাড টেস্ট করাতে হবে।
ঘরোয়া যত্ন: আপনার বাড়ি পরিষ্কার ও ধুলোমুক্ত রাখতে হবে। ঘরের আবহাওয়া স্বাভাবিক রাখতে হবে। ৬ মাসের বেশি বয়সের শিশু হলে গরম পানির ভাব ও মধু খাওয়াতে পারেন যা কাশি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
টিকা প্রধান ও ঔষধ সেবন: নিউমোনিয়ার জন্য শিশুকে অবশ্যই প্রাথমিক টিকা (PCV) নিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ সেবন করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া একা একা ওষুধ খাওয়া যাবে না।
খাদ্য ও বিশ্রাম: শিশুর দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে হালকা, পুষ্টিকর, সহজে হজম হয় এমন খাবার। শিশুকে প্রচুর পরিমাণ পানি, ফলের রস এবং মায়ের বুকের দুধ পান করাতে হবে। শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম দিতে হবে।
শিশুদের নিউমোনিয়া রোগের প্রতিরোধ
শিশুকে টিকা দেওয়া: শিশুকে নিওমোনিয়া সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের টিকা দিতে হবে। বিসিজি, হিব, হাম, নিউমোকক্কাল টিকা দিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বয়স এবং সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী টিকা গ্রহণ করতে হবে।
পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো: শিশুর খাদ্য তালিকায় সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে এবং মায়ের বুকের দুধ পান করতে হবে।প্রচুর পানি এবং তরল খাবার খেতে হবে। যা শিশুর নিউমোনিয়া প্রতিরোধের সহায়তা করবে।
শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি: পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এজন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। শিশুর জন্মের পর অন্তত ৬ মাস মায়ের বুকের দুধ পান করাতে হবে ফলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের অনুশীলন: নিয়মিত খাওয়ার আগে এবং পরে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। ঘন ঘন হাত স্যানিটাইজড করতে হবে। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনুশীলনের মাধ্যমেও নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url