লাইলাতুল কদর কবে? কদরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া

লাইলাতুল কদর কবে? কদরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া এ সম্পর্কে জানার আগে আমাদের জানতে হবে লাইলাতুল কদর কি। লাইলাতুল কদর হলো- পবিত্র রমজান মাসের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি রাত। এই রাতে পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। এ রাতের ইবাদত সাধারণত নফল ইবাদত।লাইলাতুল কদর অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং বরকতময় একটি রাত। 

লাইলাতুল কদর কবে কদরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া

মহান আল্লাহ তা'আলা কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন - এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম অর্থাৎ, এই এক রাতের ইবাদতের সওয়াব দীর্ঘ সময়ের ইবাদতের চেয়েও বেশি। কদরের রাত সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে এই আর্টিকেলটি সাজানো হয়েছে। কদরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া এবং ফজিলত সম্পর্কে নিচে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

পেজ সূচিপত্র: লাইলাতুল কদর কবে কদরের নামাজের নিয়ম নিয়ত দোয়া

লাইলাতুল কদর কি?

লাইলাতুল কদর মুসলিম উম্মার জন্য একটি বরকতময় রাত। এ রাতকে ভাগ্য রজনীর রাতও বলা হয়।কারণ এ রাতে দোয়ার মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, লাইলাতুল কদর বা ভাগ্য রজনী হলো বছরের শ্রেষ্ঠ রাত। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা'আলা এ রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা করেছেন। এ রাতের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে এ রাতের সম্মানার্থে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে 'সূরা আল কদর' নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন। লাইলাতুল কদর হলো কোরআন নাজিলের রাত, শান্তি রজনীর রাত, পূর্বের গুনাহ সমূহ মাফের রাত। এ রাত থেকে বঞ্চিত হওয়া মানেই সব হারানো। এজন্য আমরা চেষ্টা করব সবাই এই রাতে বেশি বেশি নফল ইবাদত করার।

লাইলাতুল কদর কবে?

লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট তারিখ কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ উল্লেখিত নেই। আল্লাহ তা'আলা কদরের নির্দিষ্ট তারিখ গোপন রেখেছেন। তবে হাদিিসে রমজান মাসের শেষ ১০ বিজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত সন্ধান করতে বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, "তোমরা রমজানের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো" - সহিহ বুখারী। অর্থাৎ, রমজান মাসের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ রমজান দিবাগত রাতকে বোঝানো হয়েছে।;তবে অনেক আলেমদের মতে ২৭ রমজানের রাতে কদর হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।। তবে এটি নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে অনেক মাসয়ালা রয়েছে।

আরো পড়ুন:ফজরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু থেকে শেষ বিস্তারিত

সহি বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একাধিক হাদিসে হযরত মুহাাম্মদ (সা.) বলেছেন, "তোমরা শেষ রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর" - সহীহ বুখারী: ৩/৪৭,২০২২। এই শেষ সাতের অর্থ দুই ধরনের হতে পারে। প্রথমত, সপ্তম দিনে অর্থাৎ, ২৭ তারিখে এবং দ্বিতীয়টি হল শেষ সাতটি রাতের যে কোন একটি রাতে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত এক সহিহ হাদিসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে চাই সে যেন তা ২৭ তারিখে অনুসন্ধান করে" - মুসনাদে আহমদ:৮/৪২৬, হাদিস নং : ৪৮০৮, ১০/৪৯৩, হাদিস নং : ৬৪৭৪

লাইলাতুল কদরের নামাজ সুন্নত নাকি নফল?

লাইলাতুল কদরের ইবাদত সাধারণত নফল ইবাদত। এ রাতে আমাদের বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া উচিত। লাইলাতুল কদরে আমাদের নফল নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, তওবা ইস্তেগফার, জিকির আজকার, দোয়া, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা, দান সদাকা করা ইত্যাদি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কদরের রাতের ইবাদত ফরজ বা ওয়াজিব নয়, বরং এটি নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এ রাতে বেশি থেকে বেশি ইবাদত করতেন এবং সাহাবীদেরও উৎসাহ করতেন।

তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে সালাত আদায়ের জন্য কোনো রাকাত নির্দিষ্ট করে দেননি। আমরা দুই রাকাত দুই রাকাত করে যতটা সম্ভব নফল সালাত আদায় করব। শেষ দশকে বেশি বেশি ইবাদত করা সুন্নত এবং লাইলাতুল কদরে নির্দিষ্ট ইবাদত করা নফল। এজন্য লাইলাতুল কদর উপলক্ষে ইবাদত করা নফল হলেও এর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া রাসুলের সুন্নাহ অনুসরণ করার অন্তর্ভুক্ত। কদরের রাতে ইবাদত করা নফল হলেও এর ফজিলত এতটাই বেশি যে একে গুরুত্বসহকারে প্রত্যেক মুসলমানের পালন করা উচিত।

লাইলাতুল কদরের নামাজের নিয়ম ও নিয়ত?

লাইলাতুল কদরের নামাজের নিয়ম
লাইলাতুল কদরের রাতের ইবাদাত ১০০০ মাস ইবাদত করার চেয়েও উত্তম। তাহলে আমরা বুঝতেই পারছি এ রাতের গুরুত্ব ঠিক কতোটা। লাইলাতুল কদরের নামাজের নিয়ম অন্যান্য সাধারণ নামাজের নিয়মের মতোই। শুধু আপনি যখন নামাজের জন্য নিয়ত করবেন তখন মনে মনে লাইলাতুল কদরের দুই রাকাত নফল নামাজের কথাটা উল্লেখ করবেন। বাকি সমস্ত নিয়ম অন্যান্য সালাতের ন্যায়। এভাবে দুই রাকাত দুই রাকাত করে নফল নামাজ আদায় করবেন। এ রাতে নফল ইবাদতের সওয়াব অনেক বেশি এবং এর গুরুত্বও অপরিসীম। এজন্য আমরা বেশি সওয়াব লাভ করার উদ্দেশ্যে বেশি বেশি করে নফল নামাজ আদায় করব।

লাইলাতুল কদরের নামাজের নিয়ত
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী নিয়ত হচ্ছে মনের ইচ্ছা। আপনি যদি মনের ইচ্ছা পোষণ করেন যে আপনি লাইলাতুল কদরের জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করবেন তাহলেই তা যথেষ্ট। তবে আপনি চাইলে আরবিতেও এটি উচ্চারণ করতে পারবেন। আরবিতে উচ্চারণ না করলে কোন গুনাহ হবে না। লাইলাতুল কদরের দুই রাকাত নফল নামাজের আরবি নিয়ত হল : "নাওয়াইতুয়ান উসল্লিয়া লিল্লাহি তা'আলা রাকা'তাই সালাতি লাইলাতিল কদর নফলি মুতাওয়াজ্জিহান ইলাজিহাতিল কাবাতিশ শারিফতি আল্লাহু আকবার"। এভাবে আরবি উচ্চারণ করেও নিয়ত করা যায় আর আপনি চাইলে মনে মনে নিয়ত এর মাধ্যমে কদরের দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে পারবেন।

লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও দোয়া

লাইলাতুল কদরের ফজিলত
লাইলাতুল কদর হলো কুরআন নাজিলের এক মহিমান্বিত রাত এ রাতেই কুরআন শরীফ নাযিল হয়েছে যা মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা ও পথনির্দেশক। তাই এ রাতের গুরুত্ব অনেক বেশি এবং এটি অনেক ফজিলতপূর্ণ একটি রাত। মহান আল্লাহ তা'আলা সূরা আল কদরে বলেছেন, "লাইলাতুল কদর হল হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ" - সূরা কদর আয়াত : ৩। এই একটি রাতের ইবাদত হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদত করার চেয়েও উত্তম। এ রাতে ইবাদত করলে ১০০০ মাস ইবাদত করার চাইতেও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। ও আমরা বুঝতেই পারছি এ রাতের ফজিলত কতটুকু। কুরআনের বর্ণিত আছে, এই রাতে জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহ অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে আসেন তারা মুমিন বান্দাদের ইবাদত দেখেন এবং তাদের জন্য শান্তির দোয়া করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াব হাসিলের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদত/সালাত আদায় করবে তার পেছনে সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে" - সহীহ বুখারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, "যে ব্যক্তি এই রাত থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। আর হতভাগা ছাড়া কেউ এ রাতের বরকত থেকে বঞ্চিত হয় না"- সুনানে ইবনে মাজাহ। "ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত এই রাত্রি সম্পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তায় ঘেরা" - সূরা কদর আয়াত : ৫। সুতরাং এর থেকে বোঝা যায় এটি একটি শান্তির রজনীর রাত। 

লাইলাতুল কদরের দোয়া
এ রাতের গুরুত্ব যেহেতু অনেক বেশি তাহলে আমাদের উচিত এ হাতে বেশি থেকে বেশি আল্লাহর কাছে দোয়া এবং ইস্তেগফার করা আম্মাজান আয়েশার (রা.) রাসুলকে (সা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন কদরের রাতে কি দোয়া পড়বেন রাসুল (সা.) তাকে এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন, "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি"। এর অর্থ : হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন তাই আমাকে ক্ষমা করুন। অতএব আমরা এ রাতে বেশি বেশি দোয়া করব এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেব। তাহলে মহান আল্লাহ তা'আলা ও আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেবেন। লাইলাতুল কদরের ইবাদাতই শুধু ফজিলত পূর্ণ নয় কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দরুদ, তওবা ইত্যাদি সকল নফল ইবাদতই অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

শেষ কিছু কথা: লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব সম্পর্কে

লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি এমন এক মহিমান্বিত রাত যা মহান আল্লাহ তা'আলা রমজান মাসে দান করেছেন। এ মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে সূরা আল কদর নাযিল করেছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, "এই রাতে ফেরেস্তাগণ ও রুহ (জিব্রাইল আ.) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিতে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন" - সূরা আল কদর : ৪। এ রাতে সারা পৃথিবীতে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের জন্য ফেরেশতারা নেমে আসেন, রহমত বরকত ও মাগফেরাতে ভরে যায় এই রাত, মুমিনদের দোয়া কবুলের বিশেষ রাত এটি। 

এ রাতে মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নেমে আসে, তওবা ও ইবাদতের মাধ্যমে অতীতের গুনাহ মাফের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং শয়তানের প্রভাব কমে যায়।লাইলাতুল কদর শুধু একটি রাত নয় এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা রহমত ও নাজাতের শ্রেষ্ঠ একটি উপহার মুমিনদের জন্য। হাজার মাসের চেয়েও উত্তম এ রাত আমরা সবাই ইবাদতের মধ্য দিয়ে কাটানোর চেষ্টা করব। বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করব,কোরআন তেলাওয়াত করব, জিকির ও দরুদ পড়বো, তওবা ইস্তেগফার করবো, পরিবার ও সমস্ত উম্মাহ জন্য দোয়া করব।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

Md. Jafor Sadik
Md. Jafor Sadik
আমি একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও টেক ভার্স ইনফোর Owner। আমি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করি। ৫ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছি।